আসন্ন বাজেটে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সবকার। আগামী ৫ জুন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে বাজেট উপস্থাপন করা হবে। এদিন জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি। বাজেটে এবার দুর্নীতিবাজ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় এই তিন ধরনের আর্থিক খাতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। এর আগে দ্বাদশ নির্বাচনের পর টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের হুসিয়ারি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ করে চলতি মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী ইশতেহারের ‘দুর্নীতিমুক্ত সুশাসনের বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছেন তিনি। সরকার ও দলের মধ্যেও এমন নীতির প্রতিফলন ঘটান তিনি। আগে থেকে চলে আসা সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার হয়ে ওঠে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতেই এগিয়ে চলছে সরকারের কার্যক্রম।
গত ২৯ মে বুধবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ লোকের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দুই কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ আছে কিনা আমি জানি না। নিশ্চয় তাদের কর্তব্যে কোনো প্রকার বিচ্যুতি ঘটেছে। সেখানে কী রকম সেটা আমি তো জানি না। এরআগে বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস-২) গাজী হাফিজুর রহমান এবং উপ-প্রেস সচিব (ডিপিএস) হাসান জাহিদ তুষারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার। দুজনেরই চুক্তি বাতিলের প্রথম দুটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সম্পাদিত চুক্তিপত্রের অনুচ্ছেদ-৮ অনুযায়ী তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ১ জুন থেকে বাতিল করা হলো। ওবায়দুল কাদের বলেন, বেনজীর আওয়ামী লীগ আমলে আমাদের আইজিপি ছিলেন। এখন তার ব্যাপারটা...এখন এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমরা তো একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করতে পারি না। ব্যাপারটা যখন প্রকাশ্যে এসেছে তখন দুদক তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে নিশ্চয়ই মামলা করবে। যে যতটা অপরাধ, অপকর্ম করেছে ততটা শাস্তি পেতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি আমলে তাদের কোনো নেতা, সরকারি কোনো কর্মকর্তা, পুলিশের সাবেক কোনো কর্মকর্তা তাদের কেউ কি.... ইম্পিউনিটি কালচার গড়ে তুলেছিল, তাদের কি কারো বিচার হয়েছিল? শেখ হাসিনার সৎ সাহস আছে, সে কারণে তিনি আজকে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। ওবায়দুল কাদের কাদের বলেন, যখনই যেটা প্রকাশ পাচ্ছে, সেই করোনার সময় ফেইক হসপিটাল করে যারা অপকর্ম করেছে, তাদের কিন্তু আমাদের নেত্রী ক্ষমা করেননি। আজকেও অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি পেতেই হবে, এখানে কোনো ছাড় নেই। তিনি বলেন, আজিজ আহমদ অত্যন্ত বিচক্ষণ অফিসার। খুব পড়াশোনা জানা অফিসার। তার কিছু ডিগ্রি আছে যেটা অন্য সেনা প্রধানদেরও নাকি নেই। এখন আসলে যোগ্যতার জন্যই সেনাপ্রধান করা হয়েছে। এখন সে যদি দুর্নীতি করে, তদন্ত হচ্ছে। তারও তদন্ত হবে। দুর্নীতির তথ্য পেলে তারও তদন্ত হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না, আমি এটুকু বলতে পারি। বুধবার সচিবালয়ে কল-কারখানা, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা রোধ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদকে সরকার কোনো ধরনের সুরক্ষা দেবে না। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও সাবেক সেনাপ্রধানের নানা অনিয়মের বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এ নিয়ে সরকার বিব্রত কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক স্পষ্টভাবে বলেছেন, কেউ যদি আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখানে সরকারের কোনো এমব্যারাসমেন্ট (বিব্রতকর অবস্থা) হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। তিনি বলেন, ওনারা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, সরকার কোনো রকম প্রটেকশন (সুরক্ষা) কাউকে দেবে না। আইন নিজের গতিতে চলবে। ভারতে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য খুন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, আমরা সবাই কিন্তু এ নিয়ে খুবই শকড। আপনারা জানেন ঘটনাটি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার মনে হয়, এর ওপর মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, কেউ কোনো অনিয়ম করলে তা গোপনেই করবে। সরকার কাউকে পাহারা দিতে পারবে না। তবে এসব কাজের জন্য অনিয়মকারীকেই জবাবদিহি করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার বসে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এসব নিয়ে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীর পরিচয় শুধুই অপরাধী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপরাধ করলে কেউ রেহাই পায় না।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিপুল ভোটে বিজয়ের পর টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার। চতুর্থ মেয়াদে (প্রথম) এবার বাজেটে দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মপরিকল্পনা প্রথমবারের মতো ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এবার বাজেটে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যে ধরনের ব্যবস্থাগুলো নেয়া হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে- ১. কালো টাকা সাদা করতে দেয়া হবে না: এবার অর্থবছরের সম্পূর্ণ হবে কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হচ্ছে। কোন অবস্থাতেই যেন অবৈধ কালো টাকা সাদা না হয় সে জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে বাজেটে। ২. ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: এবার বাজেটে খেলাপি ঋণ বন্ধের জন্য সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে যাচ্ছে। ইচ্ছাকৃত ভাবে যারা ঋণ খেলাপি তাদের বিরুদ্ধে সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করা হবে। পয়লা জুলাই থেকে এই সমস্ত পদক্ষেপগুলো কার্যকর করা হবে বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা বিদেশ যেতে পারবেন না, তারা কোন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারবেন না, কোন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হবে না এবং তারা সরকারের বিদ্যুৎ, গ্যাস লাইনসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা লাভ থেকে বঞ্চিত হবেন। ৩. অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সরকার বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সারা পৃথিবীতে যে সমস্ত দেশগুলোতে অর্থ পাচার হয়ে থাকে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেই সমস্ত দেশগুলোর সঙ্গে সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করবে এবং অবৈধভাবে অর্থ পাচারকারীদের নাম, পরিচয় এবং অন্যান্য তথ্যাদি সংগ্রহ করবে। সরকার প্রয়োজনে অর্থপাচারকারীদের নাম প্রকাশ করবে এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ৪. দুদককে আরও শক্তিশালী করা: অর্থ পাচার বন্ধ, দুর্নীতি দমনে সরকার দুদককে আরও শক্তিশালী করতে করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এখন সরাসরি অর্থ পাচারের ব্যাপারে কাজ করতে পারে না। এই ক্ষমতা এখন দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে আইন সংশোধনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ৫. খেলাপি ঋণ পরিশোধ করলে বিশেষ প্রণোদনা: সরকার খেলাপি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দেবে। যে সমস্ত ঋণ খেলাপিরা তাদের ঋণ পরিশোধ করবেন তাদেরকে সরকার বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুযোগ সুবিধা দেবে বলেও একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। যারা বিদেশ থেকে অর্থ বাংলাদেশে আনবে তাদেরকে আলাদা ভাবে প্রণোদনা দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যারা প্রবাস থেকে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন এবং যারা পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন তাদের জন্য আরও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয় আসন্ন বাজেটে। এছাড়াও যারা ‘ওভার ইনভয়েসিং’ এর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করছেন তাদেরকে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা হবে বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার
- আপলোড সময় : ৩০-০৫-২০২৪ ০৯:৪৩:১৫ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩১-০৫-২০২৪ ১২:১১:০৯ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ